যেমন ছিল মহানবী (সঃ) -এর কুরবানি

যেমন ছিল মহানবী (সঃ) -এর কুরবানি ফিরোজ মাহমুদ :: মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তুমি নামায পড় তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে এবং কুরবানী কর।(সুরা কাউসার) এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী (সা.)-কে নামায ও কুরবানী এই দু’টি ইবাদাতকে একত্রিত করে পালন করতে আদেশ করেছেন।

যে দু’টি বৃহত্তম আনুগত্যের অন্যতম এবং মহত্তম সমপর্যায়ের ইবাদত। আল্লাহর রসূল (সা.) সে আদেশ যথাযথভাবে পালন করেছেন। সুতরাং তিনি ছিলেন অধিক নামায কায়েমকারী ও অধিক কুরবানীদাতা। ইবনে উমার (রা.) বলেন, ‘‘নবী (সা.) দশ বছর মদীনায় অবস্থানকালে কুরবানী করেছেন।’’(তিরমিজি, মুসনাদ আহমাদ)

রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করার পর কোরবানির হুকুম অবতীর্ণ হয়। জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কোরবানি প্রথাটা কী?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত। ’ সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এতে আমাদের কী লাভ?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি পাওয়া যাবে। ’ সাহাবায়ে কেরাম আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! সওফ তথা দুম্বা, ভেড়া ও উটের পশমের বিনিময়ে কি এ পরিমাণ সওয়াব পাওয়া যাবে?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হ্যাঁ, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি দেওয়া হবে। ’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২৭ ইফাঃ হাদিসের মান: দূর্বল)

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন।আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার ১০ বছর জীবনের প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন। ’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৫০৭)

আনাস (রা.) বলেন, ‘রসূল (সা.) দীর্ঘ (ও সুন্দর) দু’শিংবিশিষ্ট সাদা-কালো মিশ্রিত (মেটে বা ছাই) রঙের দু’টি দুম্বা কুরবানী করেছেন।’( বুখারী ও মুসলিম)

তিনি কোন বছর কুরবানী ত্যাগ করতেন না।(যাদুল মাআদ ২/৩১৭) যেমন তিনি তাঁর কর্ম দ্বারা কুরবানী করতে উম্মতকে অনুপ্রাণিত করেছেন, তেমনি তিনি তাঁর বাক্য দ্বারাও উদ্বুদ্ধ ও তাকীদ করেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি (ঈদের) নামাযের পূর্বে যবেহ করে সে নিজের জন্য যবেহ করে। আর যে নামাযের পরে যবেহ করে তার কুরবানী সিদ্ধ হয় এবং সে মুসলমানদের তরীকার অনুসারী হয়।’’(বুখারী হাদিস নং৫২২৬)

তিনি আরো বলেন, ‘‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানী করে না, সে যেন অবশ্যই আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’’(মুসনাদ আহমাদ ২/৩২১, ইবনে মাজাহ ২/১০৪৪, হাকেম ২/৩৮৯) সকল মুসলিমগণ কুরবানী বিধেয় হওয়ার ব্যাপারে একমত। এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই।

তবে কুরবানী করা ওয়াজিব না সুন্নাত -এ নিয়ে মতান্তর আছে। আর দুই মতেরই দলীল প্রায় সমানভাবে বলিষ্ঠ। যাতে কোন একটার প্রতি পক্ষপাতিত্ব সহজ নয়। যার জন্য কিছু সংস্কারক ও চিন্তাবিদ্ উলামা কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার পক্ষ সমর্থন করেন। তাঁদের মধ্যে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) অন্যতম। কিন্তু অধিকাংশ সাহাবা, তাবেয়ীন এবং ফকীহগণের মতে কুরবানী সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ (তাকীদপ্রাপ্ত সুন্নাত)। অবশ্য মুসলিমের জন্য মধ্যপন্থা এই যে, সামর্থ্য থাকতে কুরবানী ত্যাগ না করাই উচিত। উচিত নিজের ও পরিবার-পরিজনের তরফ থেকে কুরবানী করা। যাতে আল্লাহর আদেশ পালনে এবং মহানবী (সা.)-এর অনুকরণে বিরাট সওয়াবের অধিকারী হতে পারে।


আরো পড়ুন: কোরবানির তাৎপর্য ও ইতিহাস


বস্তুতঃ কুরবানীতে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদতের খাতে অর্থব্যয় (ও স্বার্থত্যাগ) হয়। যাতে তাওহীদবাদীদের ইমাম ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সুন্নাহ জীবিত হয়। ইসলামের একটি প্রতীকের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

কাজেই সামর্থ্য থাকলে কোরবানি করা থেকে বিরত থাকার কোনো সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে, দান করা পৃথক একটি ইবাদত। অন্যদিকে কোরবানি করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। উভয় ইবাদতের একটি অন্যটির পরিপূরক নয়। তাই কোরবানির অর্থ দান করলে কোরবানির সওয়াব পাওয়া যাবে না। এর মাধ্যমে কোরবানি আদায় হবে না। তবে দানের সওয়াব পাওয়া যাবে।
চলবে….
লেখকঃ ইসলামি গবেষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

যুক্ত হোন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে এখানে ক্লিক করুন।

এগুলো দেখুন

সালাতুত তাসবিহ পড়ার নিয়ম

ফজরের জামাত চলা অবস্থায় সুন্নত পড়া যাবে?

জেনে নিন ফজরের জামাত চলা অবস্থায় সুন্নত পড়া যাবে? আসুন এ বিষয়ে কোরআনে কি বলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published.