৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি এক বিরাট উদ্যোগ নিয়েছে। ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর। ইতিমধ্যে দুই দফায় এই করদাতাদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রথম দফায় গত জুলাই মাসে ১৫ হাজার ৪৯৪ জন এবং দ্বিতীয় দফায় সম্প্রতি ৭২ হাজার ৩৪১ জন করদাতার রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর—এই ঘোষণার পর করদাতাদের মধ্যে কিছুটা শঙ্কা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এই আর্টিকেলে কেন এই পদক্ষেপ, কারা নির্বাচিত হয়েছেন, প্রক্রিয়া কেমন এবং একজন সাধারণ করদাতা হিসেবে আপনার করণীয় কী—সবকিছু বিশ্লেষণ করবো।

কেন ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর?

বর্তমানে বাংলাদেশে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) আছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে সাড়ে ৪২ লাখ করদাতা এ বছর রিটার্ন দিয়েছেন। এনবিআর সন্দেহ করছে যে অনেক করদাতা রিটার্নে ভুল তথ্য দিচ্ছেন, আয় গোপন করছেন বা কম কর দিচ্ছেন। ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর মূলত স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে, যাতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়।

এনবিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ করবর্ষের জন্য জমা দেওয়া রিটার্নগুলো সম্পূর্ণ অটোমেটেড পদ্ধতিতে নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এতে কোনো সনাতনি বা বাছাই করে নির্বাচনের প্রক্রিয়া নেই। সরকারি আয় বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর—এটি কর ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

কারা এই ৮৮ হাজারের তালিকায় পড়তে পারেন?

যেহেতু ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর, তাই স্বাভাবিক প্রশ্ন—আমি কি এই তালিকায় আছি? নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো থাকলে আপনার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

  • যারা রিটার্নে আয় ও করের মধ্যে বড় অসংগতি রেখেছেন।
  • যাদের আয়ের উৎসের সঙ্গে জমা দেওয়া করের সম্পর্ক নেই।
  • যারা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন কিন্তু রিটার্নে সেই আয়ের সঠিক উল্লেখ করেননি।
  • যাদের টিআইএন নম্বরের বিরুদ্ধে আগেও কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
  • প্রতিটি সার্কেল থেকে সর্বোচ্চ ২০০ এবং সর্বনিম্ন ২০ জন করদাতাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আপনার এলাকার আয়কর সার্কেলের আয়তনের ওপরও এটি নির্ভর করে।

আপনি চাইলে এনবিআরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে তালিকা দেখে নিতে পারেন। ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর বলায় অনেকেই নিজের অবস্থান জানতে উৎসুক।

আরও জানতে পারেনঃ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেশি লাভজনক কেন

যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়া কীভাবে হবে?

এনবিআরের স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) পদ্ধতি খুবই আধুনিক। ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর যেভাবে—

  1. কম্পিউটার অ্যালগরিদম: প্রথমে একটি সফটওয়্যার সব রিটার্ন স্ক্যান করে। এটি আয়, কর্তন, পূর্বে দেওয়া কর ইত্যাদি পর্যালোচনা করে।
  2. অসঙ্গতি চিহ্নিতকরণ: যেখানে অসামঞ্জস্য দেখা যায়, সেসব রিটার্নকে ফ্ল্যাগ বা চিহ্নিত করে।
  3. সার্কেলভিত্তিক বরাদ্দ: প্রতিটি আয়কর সার্কেল থেকে সর্বোচ্চ ২০০ ও সর্বনিম্ন ২০ জনকে নির্বাচন করা হয়। এতে কোনো এলাকার প্রতি পক্ষপাতিত্ব হয় না।
  4. নোটিশ প্রদান: নির্বাচিত করদাতাদের ইলেকট্রনিক বা ডাকযোগে নোটিশ পাঠানো হবে।
  5. নথি জমাদান ও জিজ্ঞাসাবাদ: করদাতাদের আয়ের প্রমাণ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সম্পদের কাগজপত্র জমা দিতে বলা হবে। প্রয়োজনে এনবিআর কর্মকর্তা সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন।
  6. চূড়ান্ত আদেশ: যাচাই শেষে যদি কর ফাঁকি প্রমাণিত হয়, তাহলে অতিরিক্ত কর ও জরিমানা ধার্য করা হবে।

এনবিআর বলছে, ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে।

করদাতাদের ওপর কী প্রভাব পড়বে?

৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর—এ ঘোষণার প্রভাব দুই ধরনের। যারা সঠিক কর দেন, তাদের জন্য এটি কোনো সমস্যা নয় বরং স্বস্তির, কারণ অন্যরা ধরা পড়বেন। আর যারা কর ফাঁকি দিয়েছেন, তাদের জন্য এটি নিদারুণ উদ্বেগের। নিচে প্রভাবের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

সৎ করদাতাদের জন্য স্বস্তি

যাঁরা নিয়মিত ও সঠিকভাবে কর দেন, তাঁদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং এনবিআরের এই উদ্যোগে বাজারের প্রতিযোগিতা বৈধ হবে এবং অসৎ ব্যবসায়ীরা সুবিধা পাবেন না।

কর ফাঁকিদের জন্য শাস্তির আতঙ্ক

যাঁরা রিটার্নে আয় কম দেখিয়েছেন বা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন, তাঁরা যদি এই তালিকায় থাকেন, তাহলে তাদের জরিমানা গুনতে হতে পারে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, কর ফাঁকির প্রমাণ হলে সর্বোচ্চ ৫০% জরিমানা পর্যন্ত হতে পারে।

ব্যবসা ও বিনিয়োগে প্রভাব

এনবিআর যখন ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে, তখন ব্যবসায়ীরা আরও সতর্ক হয়ে যাবেন। ভবিষ্যতে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পাবেন।

আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি

গুরুতর বিষয় হলো, এই উদ্যোগ দেশের আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়াবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশকে আরও বিশ্বাস করবে।

৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর—এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইতিবাচক হলেও স্বল্পমেয়াদে কিছু করদাতা আতঙ্কিত হচ্ছেন।

সাধারণ করদাতাদের কী সতর্কতা নেওয়া উচিত?

আপনি যদি সৎ করদাতা হন, তবুও কিছু প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। কারণ ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর, এবং আপনি অজান্তেই ভুল করে থাকতে পারেন।

  • প্রথমেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখে নিন আপনার টিআইএন তালিকায় আছে কি না।
  • আপনার রিটার্নের কাগজপত্র (আয়ের প্রমাণ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সম্পদের কাগজ) গুছিয়ে রাখুন।
  • নোটিশ পেলে সময়মতো জবাব দিন। অগ্রাহ্য করলে জরিমানা বাড়তে পারে।
  • যদি বোঝেন যে রিটার্নে ভুল হয়েছে, তাহলে স্বেচ্ছায় সংশোধিত রিটার্ন (revised return) জমা দেওয়ার সুযোগ নিন।
  • প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ আয়কর বিশেষজ্ঞ বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের পরামর্শ নিন।

অনেক করদাতা ভুল করে ফর্মের ঘরগুলো ঠিকমতো পূরণ করেন না। ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর, তাই এখনই আপনার রিটার্ন পুনরায় যাচাই করুন।

আয়কর রিটার্ন যাচাইয়ের প্রক্রিয়া ও আইনি ঝুঁকি

এনবিআর নিরীক্ষা কার্যক্রম চালায় আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর আওতায়। ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর, যা আইনসম্মত ও স্বচ্ছ।

  • নির্বাচিত হলে: নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
  • নিরীক্ষার সমাপ্তি: ৯০ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে নিরীক্ষা শেষ করার নিয়ম।
  • জরিমানার বিধান: আয় গোপন করলে নির্ধারিত করের অতিরিক্ত ২০% থেকে ৫০% জরিমানা। মিথ্যা তথ্য দিলে অন্যান্য শাস্তিও হতে পারে।
  • আপিলের সুযোগ: যদি এনবিআরের আদেশের বিরুদ্ধে আপত্তি থাকে, তাহলে আপিল কর্তৃপক্ষে আবেদন করা যায়।

এনবিআর ইতিমধ্যে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইঙ্গিত দিয়েছে যে ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর সম্পূর্ণ অটোমেটেড, ফলে কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণ নেই।

ভবিষ্যতে কর ব্যবস্থায় কী প্রভাব পড়বে?

পদক্ষেপটি ভবিষ্যতের কর কাঠামো উদার ও স্বচ্ছ করতে সাহায্য করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর—এটি একটি পাইলট প্রকল্পের মতো। সফল হলে পুরো কর ব্যবস্থা ডিজিটালাইজড হবে।

  • অটোমেটেডভাবে রিটার্ন নির্বাচন প্রতিবছরই চলবে।
  • করে আয় বাড়বে, যা দেশের উন্নয়নে ব্যয় হবে।
  • সাধারণ মানুষের মধ্যে কর দেওয়ার সচেতনতা বাড়বে।
  • ভবিষ্যতে হয়তো প্রতি বছর এলোমেলো নিরীক্ষা (রেন্ডম অডিট) চালু করা হবে।

৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর—এটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক সঙ্কেত।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: ৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর—আমি কীভাবে বুঝব আমি নির্বাচিত হয়েছি কিনা?
উত্তর: আপনি এনবিআরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে (nbr.gov.bd) গিয়ে আপনার টিআইএন নম্বর দিয়ে তালিকা দেখতে পারেন। পাশাপাশি মোবাইল ও ডাকযোগেও নোটিশ পাবেন।

প্রশ্ন ২: আমি তালিকায় থাকলে কত সময়ের মধ্যে জবাব দিতে হবে?
উত্তর: নোটিশ পাওয়ার ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করা যেতে পারে।

প্রশ্ন ৩: আমার রিটার্নে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল হয়ে থাকে, তাহলে কী করব?
উত্তর: সংশোধিত রিটার্ন (Revised Return) জমা দিতে পারেন। তা না করে নোটিশ পাওয়ার পর স্বীকার করলেও জরিমানা কম হতে পারে।

প্রশ্ন ৪: এই যাচাই শুধু বড় ব্যবসায়ীদের জন্য নাকি ছোট করদাতারাও থাকবেন?
উত্তর: প্রতিটি আয়কর সার্কেল থেকে সর্বনিম্ন ২০ ও সর্বোচ্চ ২০০ জন নির্বাচিত হয়েছেন। তাই ছোট ও মাঝারি করদাতারাও আছেন এই তালিকায়।

প্রশ্ন ৫: নির্বাচিত না হলে কি চিন্তা করতে হবে?
উত্তর: না। নির্বাচিত না হওয়া মানে আপনার রিটার্ন সঠিক বলে তারা ধরে নিয়েছে। তবে সব সময় কাগজপত্র সংরক্ষণ করা উচিত।

প্রশ্ন ৬: এই যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়া কি স্বচ্ছ?
উত্তর: এনবিআর দাবি করেছে, এটি সম্পূর্ণ অটোমেটেড পদ্ধতি, কোনো কর্তকর্তার ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ নেই। ফলে এটি বেশ স্বচ্ছ।

শেষকথা

৮৮ হাজার করদাতার রিটার্ন যাচাই–বাছাই করবে এনবিআর—এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কর ফাঁকি রোধ করতে এবং সরকারি রাজস্ব বাড়াতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সৎ করদাতা হিসেবে আপনার আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বরং এটি একটি ভালো সুযোগ নিজের রিটার্ন পুনরায় যাচাই করে নেওয়ার। হাতে সময় থাকতেই আপনার কর সংক্রান্ত কাগজপত্র সম্পূর্ণ করুন। যদি কোনো জটিলতা থাকে, তাহলে দ্রুত পেশাদার সাহায্য নিন। বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্বচ্ছ ও আধুনিক হচ্ছে, এবং এর সুফল পাবেন সাধারণ মানুষই। এনবিআরের অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তির আপডেট নিয়মিত দেখতে থাকুন।

এগুলো দেখুন

ফিন্যান্স কী জেনে নিন বিস্তারিত

ফিন্যান্স কী জেনে নিন বিস্তারিত

ফিন্যান্স কী জেনে নিন বিস্তারিত এ বিষয়। আসুন আজকে এ বিষয়ে আলোচনা করে বিস্তারিত জেনে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *