স্বাস্থ্যই হলো প্রতিটি মানুষের মন্ত্রের মূল চাবিকাঠি! স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মনও ভালো থাকে, কাজের অগ্রগতি বাড়ে, এবং জীবনযাত্রা সুন্দর হয়। যদি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রতি সপ্তাহে কিছু কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করুন। এভাবে পরিবর্তন আনা সহজ এবং ধারাবাহিক হবে।
একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করবে এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো রাখতে সাহায্য করবে।
ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া উচিত?
টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলেই যে আপনাকে কিছু নির্দিষ্ট খাবার পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে হবে, তা নয়। আপনি নানা ধরনের খাবার খেতে পারবেন, তবে কিছু খাবার পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
-
বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া: প্রতিদিন এক ধরনের খাবার না খেয়ে বিভিন্ন ধরনের ফলমূল, শাকসবজি, শ্বেতসার-জাতীয় খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। উদাহরণস্বরূপ: লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি ও আলু।
-
যে খাবার কমিয়ে দিন: চিনি, লবণ এবং চর্বিজাতীয় খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিন, অর্থাৎ শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় পরিমাণে খাওয়া।
-
সময়মতো খাবার খান: প্রতিদিন সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবার সময়মতো খেতে হবে, যাতে কোনো বেলার খাবার বাদ না পড়ে।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে চাইলে, প্রতি সপ্তাহে একটু একটু করে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করুন। একেবারে খাদ্যাভ্যাস পুরোপুরি বদলে ফেলার চেয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা সহজ হবে।
ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য তালিকায় যা যা থাকতে হবে
একটি স্বাস্থ্যকর ও সুষম ডায়েটের জন্য পাচঁটি প্রধান গ্রুপের খাবার খাওয়া প্রয়োজন। সেগুলো হল:
-
ফলমূল ও শাকসবজি
-
শ্বেতসার সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: লাল বা বাদামী চালের ভাত, লাল আটার রুটি)
-
প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: ডিম, মাছ, মাংস, শিম ও অন্যান্য বীন, ডাল)
-
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার (যেমন: দই, ছানা, পনির)
-
তেল, মাখন, ঘি
আপনার দৈনিক খাবার ও পানীয়ের পরিমাণ নির্ভর করবে আপনার বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক পরিশ্রম এবং আপনি আপনার ওজন ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী ধরনের লক্ষ্য নির্ধারণ করছেন তার ওপর। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অর্থ হলো কিছু খাবার বেশি এবং কিছু খাবার কম পরিমাণে খাওয়া।
ফল ও সবজি
ডায়াবেটিস থাকলেও আপনি ফলমূল খেতে পারবেন। এগুলো সাধারণত কম ক্যালোরিযুক্ত এবং ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবারে সমৃদ্ধ। এসব খাবার আপনার পরিপাকতন্ত্রের সঠিক কার্যক্রমে সাহায্য করে এবং হার্টের সমস্যা ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। তবে ফলের জুস ও স্মুদি না খাওয়ার চেষ্টা করুন, কারণ তাতে ফাইবারের পরিমাণ কম থাকে।
প্রয়োজনীয় ফলমূল ও শাকসবজি:
-
এক ফালি বাঙ্গি বা জাম্বুরা, খেজুর, আলুবোখারা
-
গাজর, মটরশুঁটি, বরবটি, শিম
-
মাশরুম, শশা, পালংশাক, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি, লেটুস
শ্বেতসার-সমৃদ্ধ খাবার
শ্বেতসার খাবারে ভাত, রুটি, পাস্তা, পাউরুটি ও কাঁচকলা রয়েছে। এসব খাবার শর্করা সরবরাহ করে, যা গ্লুকোজে পরিণত হয়ে আমাদের শরীরের কোষগুলোতে শক্তি যোগায়। তবে উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI)-যুক্ত খাবারগুলো রক্তে সুগারের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, তাই এসব খাবার কম খাওয়া উচিত।
প্রয়োজনীয় শ্বেতসার-সমৃদ্ধ খাবার:
-
লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, পাস্তা
-
গোটা শস্যদানা থেকে তৈরি হোলগ্রেইন পাউরুটি, সেদ্ধ বা বেক করা মিষ্টি আলু
প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার
প্রোটিন আমাদের পেশী সুস্থ রাখে। তবে, লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া উচিত। স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস হিসেবে সামুদ্রিক মাছ ও তৈলাক্ত মাছ, শিম, ডাল, বাদাম ও পনির উপকারী।
প্রয়োজনীয় প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার:
-
ছোট মুঠো বাদাম, ডিম, মাংসের পরিবর্তে ডাল বা শিম
-
সেদ্ধ বা গ্রিল করা মাছ-মাংস
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
দুধ, পনির ও দই ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনে সমৃদ্ধ, যা হাড় ও পেশী গঠনে সাহায্য করে। তবে, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলুন। কম চর্বিযুক্ত বিকল্প বেছে নিন।
প্রয়োজনীয় দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার:
-
এক গ্লাস দুধ, টক দই, পনির
চর্বি ও তেল
অতিরিক্ত চর্বি এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাট (যেমন: মাখন, নারিকেল তেল) এড়িয়ে চলুন। অলিভ অয়েল বা ভেজিটেবল অয়েল এর মতো সুস্থ তেল ব্যবহার করুন।
প্রয়োজনীয় তেল:
-
অলিভ অয়েল, বাদাম বাটার
ডায়াবেটিস রোগী যে খাবার এড়িয়ে চলবেন
চিনি, অতিরিক্ত লবণ, এবং চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়ার চেষ্টা করুন। এসব খাবার রক্তে সুগারের মাত্রা বৃদ্ধি করে এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
এড়িয়ে চলার খাবার:
-
বিস্কুট, চিপস, চকলেট, কেক, আইসক্রিম
-
কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি দেয়া খাবার
খাবার কমানোর উপায়
-
বাড়িতে রান্না করা খাবার খান, যাতে আপনি পরিমাণে লবণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
-
চিনি ছাড়া চা বা কফি পান করুন, এবং স্মুদি থেকে বিরত থাকুন।
-
খাবারের সাথে কাঁচা লবণ খাওয়া বন্ধ করে গোল মরিচ, মশলা ও হার্বস ব্যবহার করুন।
এই খাবারগুলোর সঠিক সমন্বয়ে তৈরি একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে এবং রোগের স্বাস্থ্যজটিলতার ঝুঁকি কমাতে উপকারী হবে।
Durba TV academic Website