আজ (বৃহস্পতিবার, ১৪ জুন) বিকেলটা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সত্যিই একটা স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকল। জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যখন নবম পে স্কেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন, তখন পুরো সংসদ ভবনেই একটা উচ্ছ্বাসের ছাপ স্পষ্ট ছিল। আমি নিজে যেমন খবরটি সংগ্রহ করছিলাম, তেমনই একাধিক সরকারি কর্মচারীর কাছ থেকে ফোন আসতে শুরু করে—‘শুনলেন ভাই, অবশেষে হলো!’ এই দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে যে ঘোষণা এলো, তা সত্যি বলতে অনেকের জন্যই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার মতো।
অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, আগামী ১ জুলাই থেকেই এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, নতুন এই বেতন কাঠামোর জন্য বাজেটে ঠিক কত টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, সে বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতায় কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। এই ব্যাপারটা অনেকেই খেয়াল করেননি বলেই আমার ধারণা।
এক নজরে নবম পে স্কেলের মূল বিষয়গুলো
ঘোষণার পর থেকেই চাকরিজীবীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কী কী সুবিধা মিলবে, কবে থেকে কার্যকর হবে, বেতন কত বাড়বে? আসুন, এক নজরে দেখে নেওয়া যাক মূল পয়েন্টগুলো:
- ঘোষণার দিন: আজ (বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬) জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায়।
- কার্যকরের তারিখ: আগামী ১ জুলাই, ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন।
- অপেক্ষার সময়: সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম পে স্কেল দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ১১ বছর পর এই ঘোষণা।
- বাস্তবায়ন পদ্ধতি: মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
- উদ্দেশ্য: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে সরকারি কর্মচারীদের সুষম জীবনমান নিশ্চিত করা।
ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথে নতুন বেতন কাঠামো
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী যে কথাটি বেশ জোর দিয়েই বলেছেন, সেটি হলো এই নতুন বেতন কাঠামো একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। আসলে এই ব্যাপারটা অনেকেই পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। কেউ কেউ ভাবছেন, ১ জুলাই থেকেই পুরো বেতন কাঠামো পাল্টে যাবে। কিন্তু তা নয়। অর্থমন্ত্রী স্পষ্টই বলেছেন, ‘আমরা সরকারি কর্মচারিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সহায়তার জন্য নতুন বেতন কাঠামো তথা নবম জাতীয় পে স্কেল আগামী ১ জুলাই (২০২৬) হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।’
সত্যি বলতে, এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কারণটা বেশ যুক্তিসঙ্গত। একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, হঠাৎ করে পুরো বেতন কাঠামো পাল্টে দিলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ অনেক বেড়ে যাবে। তাই ধীরে ধীরে, পরিকল্পিতভাবে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আমার মনে হয়, চাকরিজীবীদের জন্য এটাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পন্থা।
১১ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান
২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল চালু হওয়ার পর থেকে সরকারি কর্মচারীরা নতুন কোনো বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সময় যেতে থাকে, মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে, আর চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়তে থাকে। এই ১১ বছরে দেশের অর্থনীতি অনেক বদলেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি হয়েছে, কিন্তু চাকরিজীবীদের বেতন একই জায়গায় আটকে ছিল। এই পরিস্থিতিতে নবম পে স্কেল ঘোষণা আসলে সময়ের দাবি ছিল (Demand for new pay scale announcement for govt employees)।
একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মচারীর সাথে কথা হচ্ছিল আজ সকালে। তিনি বলছিলেন, ‘২০১৫ সালে যখন অষ্টম পে স্কেল পাই, তখন মনে হয়েছিল আর কখনো বেতন বাড়বে না। কিন্তু আজ দেখি, অবশেষে সেই দিন এলো।’ তাঁর গলায় স্বস্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল।
কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়লো?
নতুন এই বেতন কাঠামোতে গ্রেডভিত্তিক বেতন কেমন হবে, তা নিয়ে চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে। নিচের টেবিলটি দেখলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন, ২০১৫ সালের অষ্টম পে স্কেলের সাথে ২০২৫ সালের প্রস্তাবিত নবম পে স্কেলের তুলনা কী দাঁড়াচ্ছে।
| গ্রেড | জাতীয় পে স্কেল ২০১৫ (টাকা) | প্রস্তাবিত পে স্কেল ২০২৫ (টাকা) |
|---|---|---|
| গ্রেড-১ | ৭৮,০০০ | ১,৬০,০০০ |
| গ্রেড-২ | ৬৬,০০০ | ১,৩২,০০০ |
| গ্রেড-৩ | ৫৬,৫০০ | ১,১৩,০০০ |
| গ্রেড-৪ | ৫০,০০০ | ১,০০,০০০ |
| গ্রেড-৫ | ৪৫,০০০ | ৮৬,০০০ |
| গ্রেড-৬ | ৩৫,৫০০ | ৭১,০০০ |
| গ্রেড-৭ | ২৯,০০০ | ৫৮,০০০ |
| গ্রেড-৮ | ২৩,০০০ | ৪৯,৭০০ |
| গ্রেড-৯ | ২২,০০০ | ৪৫,১০০ |
| গ্রেড-১০ | ১৬,০০০ | ৩২,০০০ |
| গ্রেড-১১ | ১২,৫০০ | ২৫,০০০ |
| গ্রেড-১২ | ১১,০০০ | ২৪,০০০ |
| গ্রেড-১৩ | ১০,২০০ | ২৪,০০০ |
| গ্রেড-১৪ | ৯,৭০০ | ২০,৫০০ |
| গ্রেড-১৫ | ৯,০০০ | ১৮,৮০০ |
| গ্রেড-১৬ | ৮,৫০০ | ২১,০০০ |
| গ্রেড-১৭ | ৮,০০০ | ২৪,৮০০ |
| গ্রেড-১৮ | ৭,৮০০ | ২১,০০০ |
| গ্রেড-১৯ | ৭,৫০০ | ২০,৫০০ |
| গ্রেড-২০ | ৮,২৫০ | ২০,০০০ |
টেবিলটি দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, প্রতিটি গ্রেডের বেতনই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এছাড়া নিচের গ্রেডগুলোর বেতনও যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে।
বেতন-ভাতার অন্যান্য সুবিধাও বাড়বে
শুধু মূল বেতন নয়, নতুন এই পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধাও বাড়বে (Salary and allowances will increase significantly)। আসলে, বেতন কাঠামো পরিবর্তনের সাথে সাথে ভাতার হারও পরিবর্তিত হয়। তবে ভাতার নতুন হার সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরকার এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
এই ব্যাপারটা অনেকেই জানেন না যে, বেতন বাড়লে শুধু হাতে টাকা বেশি আসে না বরং পেনশন, গ্র্যাচুইটিসহ অন্যান্য সুবিধাও বাড়ে। তাই চাকরিজীবীদের জন্য এটি একটি সামগ্রিক সুখবর।
প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ
অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় স্পষ্টভাবেই বলেছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত বৈষম্য কমিয়ে সমতাভিত্তিক সুষম উন্নয়নে বহুমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। এই নবম পে স্কেল সেই পরিকল্পনারই একটি অংশ।
আমার মনে হচ্ছে, এই ঘোষণার মাধ্যমে সরকার শুধু চাকরিজীবীদের জন্যই সুখবর আনেনি, বরং দেশের অর্থনীতিতেও একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে চেয়েছে। কারণ চাকরিজীবীদের আয় বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে সহায়তা করবে।
চাকরিজীবীদের প্রতিক্রিয়া
ঘোষণার পরপরই আমি কয়েকজন সরকারি কর্মচারীর সাথে কথা বলেছি। তাঁদের মধ্যে যেমন আনন্দ আছে, তেমনই কিছু প্রশ্নও আছে। একজন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী বলছিলেন, ‘বেতন তো বাড়ছে, কিন্তু দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতিতে আসলে কী লাভ হবে, সেটাই ভাবছি।’ অন্যদিকে, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। আশা করি, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার চাকরিজীবীদের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।’
সত্যি বলতে, চাকরিজীবীদের মধ্যে এই মিশ্র প্রতিক্রিয়াই স্বাভাবিক। কারণ বেতন বাড়লেও, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় বৃদ্ধির হার হয়তো ততটা হবে না যতটা কল্পনা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘ ১১ বছর পর যে নতুন বেতন কাঠামো আসছে, সেটা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক।
নবম পে স্কেল সম্পর্কিত কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: নবম পে স্কেল কবে থেকে কার্যকর হবে?
উত্তর: অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই, ২০২৬ থেকে এই নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
প্রশ্ন: এই বেতন কাঠামো কি সব সরকারি কর্মচারীর জন্য প্রযোজ্য?
উত্তর: হ্যাঁ, জাতীয় পে স্কেল সাধারণত সকল সরকারি কর্মচারীর জন্য প্রযোজ্য। তবে কোনো বিশেষ বিভাগ বা সংস্থার জন্য আলাদা কোনো নিয়ম থাকলে তা পরবর্তীতে জানানো হবে।
প্রশ্ন: নতুন বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন কত?
উত্তর: প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-২০ (সর্বনিম্ন) এর বেতন ২০,০০০ টাকা এবং গ্রেড-১ (সর্বোচ্চ) এর বেতন ১,৬০,০০০ টাকা। তবে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা যোগ হলে মোট বেতন আরও বাড়বে।
প্রশ্ন: বাজেটে নবম পে স্কেলের জন্য কত টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে?
উত্তর: অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এই বেতন কাঠামোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দের তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে সরকার ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলায়, প্রয়োজনীয় অর্থ বাজেটের অন্যান্য খাত থেকে সমন্বয় করে নেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন: ২০১৫ সালের অষ্টম পে স্কেলের সাথে নবম পে স্কেলের তুলনা করলে কেমন হবে?
উত্তর: প্রায় সব গ্রেডের ক্ষেত্রেই ২০১৫ সালের তুলনায় বেতন দ্বিগুণের কাছাকাছি বা তার বেশি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গ্রেড-১ এর বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৬০,০০০ টাকা হয়েছে।
প্রশ্ন: ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন মানে কী? পুরো বেতন কি একসাথে বাড়বে না?
উত্তর: অর্থমন্ত্রী ‘ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন’ বলতে বোঝাতে চেয়েছেন যে, পুরো বেতন কাঠামো একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা হবে। অর্থাৎ প্রথম ধাপে কিছু পরিবর্তন আনা হবে, তার পরবর্তী ধাপে বাকি পরিবর্তন। এর ফলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে।
প্রশ্ন: নবম পে স্কেল কার্যকর হলে কি পেনশন ও গ্র্যাচুইটিও বাড়বে?
উত্তর: হ্যাঁ, বেতন কাঠামো পরিবর্তনের সাথে সাথে পেনশন, গ্র্যাচুইটিসহ অন্যান্য সুবিধাও বাড়বে। কারণ এই সুবিধাগুলো মূল বেতনের ওপর নির্ভর করে।
প্রশ্ন: নতুন বেতন কাঠামোর বিস্তারিত প্রজ্ঞাপন কবে জারি হবে?
উত্তর: এখনো সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। তবে ঘোষণার পর থেকে মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। আগামী ১ জুলাইয়ের আগেই বিস্তারিত প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
Durba TV academic Website