পে-স্কেলে অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন যারা

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। খবরটি নিশ্চিত করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একটি সূত্র। এই নবম পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিশেষ সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের জন্যও একটি সমন্বিত বেতন কাঠামো ও নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট সব খাতের কর্মীরা নতুন বেতন ব্যবস্থার সুবিধা সমানভাবে উপভোগ করতে পারেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পে-স্কেল অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন যারা, তাদের মধ্যে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবারের পে-স্কেলে তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা রাখার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। গত ২১ মে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. নাসিমুল গনির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত পুনর্গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশন, বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির সুপারিশগুলো বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামোর মূল বৈশিষ্ট্য

প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তুলনায় নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি ও ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বিদ্যমান বেতন বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে একাধিক প্রস্তাব ও সুপারিশ আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে দুটি প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে:

  • প্রথম প্রস্তাব: অধিকাংশ গ্রেডের মূল বেতন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। এতে চতুর্থ গ্রেডের অধ্যক্ষদের বর্তমান ৫০ হাজার টাকার বেসিক বেড়ে ৭৫ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী অধ্যাপকদের ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার বেসিক দাঁড়াতে পারে ৫৩ হাজার ২৫০ টাকায়।
  • দ্বিতীয় প্রস্তাব: সবচেয়ে বেশি সুবিধা দেওয়া হতে পারে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের। ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে ১৬তম গ্রেডের অফিস সহকারীদের ৯ হাজার ৩০০ টাকার বেতন বেড়ে ১৮ হাজার ৬০০ টাকা এবং ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়কদের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা হতে পারে।

প্রশাসন ও শিক্ষা খাতে প্রভাব

নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় প্রশাসন ও শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় সহায়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বিদ্যমান বেতন বৈষম্য হ্রাস করে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বেতন কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।

গ্রেড/পদ বর্তমান বেসিক (টাকা) প্রস্তাবিত বেসিক (টাকা)
চতুর্থ গ্রেড (অধ্যক্ষ) ৫০,০০০ ৭৫,০০০
ষষ্ঠ গ্রেড (সহকারী অধ্যাপক) ৩৫,৫০০ ৫৩,২৫০
সপ্তম গ্রেড (প্রধান শিক্ষক) ২৯,০০০ ৪৩,৫০০
নবম গ্রেড (প্রভাষক) ২২,০০০ ৩৩,০০০
১১তম গ্রেড (শিক্ষক) ১২,৫০০ ২৫,০০০ (দ্বিতীয় প্রস্তাব)
১৬তম গ্রেড (অফিস সহকারী) ৯,৩০০ ১৮,৬০০ (দ্বিতীয় প্রস্তাব)
২০তম গ্রেড (অফিস সহায়ক) ৮,২৫০ ১৬,৫০০ (দ্বিতীয় প্রস্তাব)

স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও পাবেন সুবিধা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরাও নতুন পে-স্কেলের আওতায় আসবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর ফলে দেশের সব সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে বেতন-ভাতার সমতা আনতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা এই সুবিধা পাবেন।

সময়সীমা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আগস্ট বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লাগলেও জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা কার্যকর হবে। পরে গেজেট প্রকাশ হলে চাকরিজীবীরা জুলাই থেকে বকেয়াসহ বর্ধিত সুবিধা পাবেন। এর আগে আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন বসতে যাচ্ছে, যেখানে নতুন পে-স্কেলের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহণ ব্যয়সহ প্রায় সব খাতে ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে। এ কারণে নতুন পে-স্কেলে নিম্ন আয়ের কর্মীদের বেতন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর। ফলে নতুন পে-স্কেলে তাদের জন্য তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কোন প্রস্তাব চূড়ান্ত হবে, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতনসংক্রান্ত সুপারিশ পর্যালোচনার পর সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণ না হলেও আলোচনায় থাকা দুই বিকল্পের মধ্যে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখার বিষয়টি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী জুলাই থেকেই দেশের কোটি সরকারি কর্মচারী নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পেতে শুরু করবেন, যা তাদের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট লাঘবে সহায়ক হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *