শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন বাড়বে যেমন

দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের দাবি, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন বাড়বে যেমন’—এই আশঙ্কা এবার বাস্তব রূপ নিতে চলেছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ব্যাপক গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে শুধু মূল বেতন নয়, ভাতা, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে স্কুল ও কলেজের প্রধান শিক্ষক, উপাধ্যক্ষ এবং প্রভাষকদের বেতন কাঠামোতে যে বিপ্লব ঘটতে চলেছে, তা শিক্ষক সমাজের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।

জাতীয় বেতন কমিশনের আলোচনায় থাকা প্রস্তাবনা অনুযায়ী, সপ্তম গ্রেডের প্রধান শিক্ষক ও উপাধ্যক্ষদের বর্তমান বেসিক বেতন ২৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৩ হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে নবম গ্রেডের প্রভাষকদের ক্ষেত্রে বর্তমান ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৫০ শতাংশ, যা সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে যেমন আগ্রহ বাড়িয়েছে, তেমনি নীতিনির্ধারকদের মাঝে জোর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাবে কী আছে?

সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণে বর্তমানে দুটি বিকল্প প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রথম প্রস্তাবটি মূলত উচ্চ ও মধ্য গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বড় সুবিধা এনে দিতে পারে। এই প্রস্তাবে মূল বেতন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির বিষয়টি জোরালোভাবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে দ্বিতীয় প্রস্তাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারেন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা। আলোচনায় থাকা এই বিকল্প অনুযায়ী, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বড় সুবিধা

নীতিনির্ধারকদের মতে, মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর। ফলে নতুন পে-স্কেলে তাদের জন্য তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় প্রস্তাব অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের শিক্ষকদের বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার বেসিক বেতন বেড়ে ২৫ হাজার টাকায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ১৬তম গ্রেডের অফিস সহকারীদের বর্তমান ৯ হাজার ৩০০ টাকার বেতন বেড়ে ১৮ হাজার ৬০০ টাকা এবং ২০তম গ্রেডের অফিস সহায়কদের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

গ্রেড পদবি বর্তমান বেতন (টাকা) প্রস্তাবিত বেতন (টাকা)
সপ্তম প্রধান শিক্ষক/উপাধ্যক্ষ ২৯,০০০ ৪৩,৫০০
নবম প্রভাষক ২২,০০০ ৩৩,০০০
একাদশ শিক্ষক ১২,৫০০ ২৫,০০০
ষোড়শ অফিস সহকারী ৯,৩০০ ১৮,৬০০
বিংশ অফিস সহায়ক ৮,২৫০ ১৬,৫০০

শিক্ষক সমাজের প্রতিক্রিয়া ও চ্যালেঞ্জ

ঢাকার একটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আবু সাঈদ মোল্লা বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে আসছি। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে শিক্ষকদের মানসিক ও আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমবে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা যেভাবে দ্বিগুণ বেতনের আশা করছেন, তা সত্যিই আশাপ্রদ।”

তবে সব পক্ষই যে একমত, তা নয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে, কারণ এই সুপারিশ মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রযোজ্য। তারা আশা করছেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও একই রকম বেতন কাঠামো চালু করার নির্দেশনা আসবে। অন্যথায় সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বেতনের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে বলে মনে করেন তারা।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথে আরও কিছু পদক্ষেপ

তবে কোন প্রস্তাব চূড়ান্ত হবে, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। জাতীয় বেতন কমিশন, জুডিসিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতনসংক্রান্ত সুপারিশ পর্যালোচনার পর সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। ওই দিন বিকেল ৩টায় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এটি হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন। সেখানে বাজেট পেশের সময় পে-স্কেলের বিষয়টি স্পষ্ট হবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।

নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণ না হলেও আলোচনায় থাকা দুই বিকল্পের মধ্যে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখার বিষয়টি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের জন্য সপ্তম ও নবম গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবনাটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো মানে শিক্ষার মান বাড়ানো। একটি উন্নত বেতন কাঠামো শিক্ষকদের মধ্যে দক্ষতা ও নিষ্ঠা বৃদ্ধি করে, যা শেষপর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্যই সুফল বয়ে আনে।

সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও, নীতিনির্ধারক মহলে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী জুলাই মাসের মধ্যে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের বেতন যেমন বাড়বে, তেমনি গোটা শিক্ষাব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *