প্রায় দেড় দশকের দীর্ঘ অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় পর ‘সরকারি চাকুরেদের জন্য আসছে ‘বড় সুখবর’—নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে সরকার। আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সূত্রমতে, চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ ও অন্যান্য দাপ্তরিক কাজ শেষ হতে কিছুটা দেরি হলেও, নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই চাকরিজীবীরা বাড়তি বেতনের সুবিধা পাবেন—এমন একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও এই নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন। একইসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের জন্যও থাকছে বড় ধরনের সুখবর। বিশেষ করে কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে, যা লাখ লাখ প্রবীণ নাগরিকের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে।
কেন দরকার ছিল নবম পে-স্কেল?
সর্বশেষ, অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে। এরপর এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয়সহ প্রায় সব খাতে ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছেন। আমি নিজে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দেখেছি, একজন ২১তম গ্রেডের অফিস সহায়কের পরিবার চালাতে কতটা হিমশিম খেতে হয়। এক কেজি আলু থেকে শুরু করে সন্তানের স্কুলের ফি—সবকিছুর দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, কিন্তু বেতন সেভাবে বাড়েনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি চাকরিতে বেতন বৈষম্য কমানোর চাপে সরকার নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে।
সরকারি চাকুরেদের জন্য আসছে ‘বড় সুখবর’
পে-কমিশনের আলোচনায় বর্তমানে দুটি বিকল্প গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমটি হলো অধিকাংশ গ্রেডে মূল বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং দ্বিতীয়টি হলো ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন দ্বিগুণ করার ব্যবস্থা। নিচের সারণিতে তুলনামূলক তথ্য দেওয়া হলো:
| গ্রেড | পদবী (উদাহরণ) | বর্তমান বেসিক (টাকা) | প্রস্তাবিত বেসিক (টাকা) | বৃদ্ধির হার |
|---|---|---|---|---|
| ৪র্থ গ্রেড | অধ্যক্ষ | ৫০,০০০ | ৭৫,০০০ | ৫০% |
| ৬ষ্ঠ গ্রেড | সহকারী অধ্যাপক | ৩৫,৫০০ | ৫৩,২৫০ | ৫০% |
| ৭ম গ্রেড | প্রধান শিক্ষক/উপাধ্যক্ষ | ২৯,০০০ | ৪৩,৫০০ | ৫০% |
| ৯ম গ্রেড | প্রভাষক | ২২,০০০ | ৩৩,০০০ | ৫০% |
| ১১তম গ্রেড | শিক্ষক (নিম্নমাধ্যমিক) | ১২,৫০০ | ২৫,০০০ | ১০০% |
| ১৬তম গ্রেড | অফিস সহকারী | ৯,৩০০ | ১৮,৬০০ | ১০০% |
| ২০তম গ্রেড | অফিস সহায়ক | ৮,২৫০ | ১৬,৫০০ | ১০০% |
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো পেনশন কাঠামোর পরিবর্তন। বর্তমানে যেসব অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কম পেনশন পাওয়া লাখো অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি আর্থিকভাবে উপকৃত হতে পারেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক হিসেবে মামা ৮ হাজার টাকা পেনশন পেতেন, যা দিয়ে তার ওষুধ আর ডায়াবেটিসের খরচই চলত না। এই পরিবর্তন তাঁদের জীবনযাত্রায় নতুন আশার সঞ্চার করবে।
কারা পাবেন এই সুবিধা?
নতুন পে-স্কেলের আওতায় প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী এবং স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ ছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা চলছে। গত ২১ মে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের পুনর্গঠিত কমিটির বৈঠকে নবম পে-স্কেল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশন, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করা হয়।
বাস্তবায়নের সময়সীমা ও বাজেট প্রস্তুতি
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আগস্ট বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় লাগলেও জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা কার্যকর হবে। পরে গেজেট প্রকাশ হলে চাকরিজীবীরা জুলাই থেকে বকেয়াসহ বর্ধিত সুবিধা পাবেন। তবে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে নবম পে-স্কেল একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে:
- প্রথম ধাপ: আগামী অর্থবছরে মূল বেতনের অর্ধেক বৃদ্ধি কার্যকর হবে।
- দ্বিতীয় ধাপে: দ্বিতীয় বছরে বাকি অংশ বাস্তবায়ন করা হবে।
- তৃতীয় ধাপে: তৃতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা যুক্ত করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রথম বছরেই অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে একটি বিশেষ থোক বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দেওয়া সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলেও, এটি দেশের ২০ লাখের বেশি সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের জন্য বিশাল স্বস্তি বয়ে আনবে।
সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ ও ইতিবাচক দিক
গত ২১ মের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিনটি প্রতিবেদনের মধ্যে দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বেতন বৃদ্ধি, ভাতা কাঠামো এবং বাজেট সক্ষমতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তৃতীয় প্রতিবেদনটি পরবর্তী বৈঠকে আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে। এটি স্পষ্ট যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, যাতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। আমার ধারণা, এই পদক্ষেপ শুধু সরকারি কর্মচারীদের নয়, পুরো অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ বাড়তি বেতন বাজারচাহিদা তৈরি করবে, যা ব্যবসায়ীদের জন্যও সুবিধাজনক হবে। দীর্ঘ ১০ বছরেরও বেশি সময় পর অবশেষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেল নিয়ে আসছে সরকার—এটি শুধু আর্থিক উন্নতি নয়, বরং কর্মীদের প্রতি রাষ্ট্রের কৃতজ্ঞতা ও সম্মানের প্রতীক। নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই এটি কার্যকর হবে, যা দেশের সেবাকর্মীদের মুখে হাসি ফোটাবে।
Durba TV academic Website