দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা। শুরুতেই এই উদ্যোগকে ঘিরে ছিল অনেক আশা। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র দিন দিন যেন উল্টো পথে হাঁটছে। প্রশ্ন উঠেছে, ভেঙে যাচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক? কার্যক্রম পুরোপুরি চালু না হওয়া, অংশীদার ব্যাংকগুলোর সরে দাঁড়ানোর আগ্রহ এবং গ্রাহক আস্থার সংকট—সব মিলিয়ে এই উদ্যোগটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে। চলুন, বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা যাক।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কী এবং কেন তৈরি হয়েছিল?
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠিত হয় ২০২৪ সালের ২১ ডিসেম্বর। পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে এটি করা হয়। ব্যাংকগুলো হলো: এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। মূল লক্ষ্য ছিল ভঙ্গুর এই ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি, তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি: প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ব্যাংকটির কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া ভীষণ ধীরগতির। অনেক শাখায় প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেবা পৌঁছায়নি। শুরুতেই যে আস্থার সংকট ছিল, তা কাটার বদলে আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ শুরু থেকেই ছিল উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ একীভূত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যাংকের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক।
অংশীদার ব্যাংকগুলোর সরে দাঁড়ানোর প্রবণতা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি হলো সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল) সম্মিলিত কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালক ও সাবেক চেয়ারম্যান রেজাউল হকের করা এই আবেদন আর্থিক খাতে বড় আলোচনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এক্সিম ব্যাংকও একই পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। এই দুটি ব্যাংকের অবস্থান পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে একীভূত কাঠামোর ভেতরে সমন্বয়ের বড় ঘাটতি রয়েছে।
আরও জেনে নিনঃ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেশি লাভজনক কেন
আর্থিক দুর্বলতার চিত্র: খেলাপি ঋণের ভয়াবহতা
একীভূত হওয়ার আগে পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৮ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত। মোট ঋণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই অনাদায়ী। নিচের টেবিলটি পরিস্থিতি পরিষ্কার করবে:
ব্যাংকের নামখেলাপি ঋণের হার (%)আনুমানিক খেলাপি ঋণ (কোটি টাকা)এক্সিম ব্যাংকপ্রায় ৫৫%বিস্তারিত অনির্ভরফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকপ্রায় ৭০%৩০,০০০+গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকপ্রায় ৮০%৩৫,০০০+ইউনিয়ন ব্যাংকপ্রায় ৪৮%২০,০০০+সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকপ্রায় ৯৭%৪০,০০০+
এমন পরিস্থিতিতে শুধু ব্যাংকগুলোকে একত্রিত করলেই সমাধান আসে না। সমস্যার মূল কাঠামো পরিবর্তন না হলে টেকসই উন্নয়ন কঠিন, এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা
এই ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাপক তারল্য সহায়তা দিয়েছে। প্রয়োজনে টাকা ছাপিয়েও সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এত কিছুর পরও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা না আসায় প্রশ্ন উঠেছে নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, একীভূত প্রক্রিয়া এখনও চলমান এবং ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামো শক্তিশালী করার কাজ হচ্ছে। নতুন করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ ও বোর্ড পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
নতুন আইন ও জটিলতা: ১৮(ক) ধারার প্রভাব
সম্প্রতি প্রণীত ব্যাংক রেজ্যুলেশন কাঠামোতে নতুন কিছু বিকল্প রাখা হয়েছে: লিকুইডেশন, ব্রিজ ব্যাংকে হস্তান্তর, নতুন বিনিয়োগকারীর কাছে হস্তান্তর এবং সাবেক শেয়ারধারীদের ফিরে আসার সুযোগ। বিশেষ করে ১৮(ক) ধারার কারণে সাবেক মালিকরা ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছেন। সমালোচকদের প্রশ্ন, আগের মালিকানা ফিরলে কি আগের অনিয়মগুলোও ফিরে আসবে? যদি সেই ঝুঁকি থেকে যায়, তাহলে একীভূত করাটা ব্যর্থ বলেই ধরা হবে।
গ্রাহক আস্থা ও ব্যাংক কর্মীদের অবস্থা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গ্রাহক আস্থা ফিরিয়ে আনা। বর্তমানে ব্যাংকটিতে প্রায় ৯১ লাখ ৫০ হাজার হিসাব রয়েছে। কর্মীর সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। কিন্তু বাস্তবতা হলো অনেক শাখায় গ্রাহক উপস্থিতি কমেছে, নতুন আমানত জমার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। টাকা উত্তোলনে নানা সীমাবদ্ধতা গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। একজন গ্রাহক বললেন, ‘টাকা রাখতে ভয় লাগে, তুলতেও সমস্যা—এ অবস্থায় ব্যাংকের ওপর কীভাবে ভরসা করব?’
ব্যাংক কর্মীরাও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শাখা ব্যবস্থাপক বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক যদি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দেয় এবং আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারি, তাহলে ধীরে ধীরে গ্রাহক সেবা স্বাভাবিক করা সম্ভব।’
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ভেঙে যাবে নাকি টিকে থাকবে?
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, ভেঙে যাচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক?—এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ নয়, কিন্তু পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ:
- নীতিগত স্থিতিশীলতা: বারবার নীতি পরিবর্তন আস্থা নষ্ট করে। দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ দরকার।
- সুশাসন নিশ্চিত করা: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া কোনো সংস্কার টেকসই হবে না।
- খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার: এটাই মূল সমস্যা। ঋণ আদায়ের কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংক চাঙ্গা হবে না।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রস্তাব: কতটা বাস্তবসম্মত?
এসআইবিএল তাদের আবেদনে ব্যাংকটিকে পৃথক করে পুনর্গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। তারা বলেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ কমানো হবে এবং ২২টি সরকারি হিসাব পুনরায় চালু করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ফেরত আনা হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় সংকটের মধ্যে এগুলো অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
সরকারের ভূমিকা: চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোন দিকে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, সরকার এই ব্যাংকগুলো স্থায়ীভাবে নিজেদের হাতে রাখার জন্য একীভূত করেনি। বরং পরিস্থিতি উন্নত হলে আবার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি কেউ বিনিয়োগ করে এই ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে চায়, তাহলে তাকে স্বাগত জানানো হবে।’ তবে এসআইবিএলের আবেদন ও এক্সিম ব্যাংকের সম্ভাব্য সরে যাওয়ার ঘটনা পুরো প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে?
উত্তর: এখন পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি অংশীদার ব্যাংক বেরিয়ে যেতে চাওয়ায় ব্যাংকটি ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
প্রশ্ন ২: সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক কেন বেরিয়ে যেতে চাচ্ছে?
উত্তর: ব্যাংকটির সাবেক পরিচালক ও উদ্যোক্তারা মনে করছেন, পৃথক থেকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন আইনের ১৮(ক) ধারার সুযোগ নিতে চান।
প্রশ্ন ৩: আমার যদি এই ব্যাংকে টাকা জমা থাকে, তাহলে আমার করণীয় কী?
উত্তর: আতঙ্কিত না হয়ে নিয়মিত ব্যাংকের আপডেট ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। চাইলেই কিছু জরুরি প্রয়োজনে টাকা তুলতে পারেন। তবে বড় অঙ্কের লেনদেনের আগে শাখার সাথে কথা বলুন।
প্রশ্ন ৪: একীভূত উদ্যোগ ব্যর্থ কেন হচ্ছে?
উত্তর: মূল কারণ হলো খেলাপি ঋণের বিশাল স্তূপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অংশীদার ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, এবং বারবার নীতিগত পরিবর্তন। শুধু একীভূত করলেই সমস্যার সমাধান হয় না।
প্রশ্ন ৫: সরকার চাইলে কি ব্যাংকটিকে বাঁচাতে পারে?
উত্তর: সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে বাঁচাতে পারে, কিন্তু তা করার জন্য প্রয়োজন কঠোর ঋণ আদায়, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছ শাসন। শুধু টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল দেয় না।
প্রশ্ন ৬: ব্যাংকটি ভেঙে গেলে আমানতকাররা কী টাকা ফেরত পাবেন?
উত্তর: ব্যাংক ভেঙে গেলে আমানত বীমা স্কিম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা আছে। তার বেশি টাকার বিষয়টি নির্ভর করবে ব্যাংকের সম্পদ বিক্রির ওপর।
প্রশ্ন ৭: অন্য ব্যাংকগুলোও কি সরে যাবে?
উত্তর: বর্তমানে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে এবং এক্সিম ব্যাংক আলোচনা করছে। অন্য ব্যাংকগুলো এখন নীরব থাকলেও পরিস্থিতির ওপর তাদের সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ভাঙার শঙ্কা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক বেরিয়ে যাওয়া, এক্সিম ব্যাংক সরে দাঁড়ানো, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা, ব্যাংক একীভূতকরণ সংকট, ১৮(ক) ধারার প্রভাব, ইসলামী ব্যাংক খেলাপি ঋণ
Durba TV academic Website