পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটি শেষে আগামী ৭ জুন থেকে সারাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খুলছে শ্রেণি কার্যক্রম। দীর্ঘ ১০ দিনের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকার পর শিক্ষার্থীরা আবারও স্কুল-কলেজে ফিরবে। কিন্তু এই আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যেও একটি বড় উদ্বেগের নাম ডেঙ্গু। কারণ, বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘ ছুটির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জমে থাকা পানি, অপরিষ্কার পরিবেশ এবং মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরুর আগেই মানতে হবে যেসব নির্দেশনা, সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসুন জেনে নেওয়া যাক, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতে কর্তৃপক্ষ কী কী নির্দেশনা দিয়েছে এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে।
রোববার (৩১ মে) মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক কর্মকর্তা জানান, স্কুল-কলেজ খোলার আগে কর্তৃপক্ষের পূর্ব নির্দেশনা অনুযায়ী ডেঙ্গুরোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, “সকালে খোলার আগে স্কুল-কলেজের জানালা-দরজাসহ সবকিছু ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। মশক কোথাও থাকলে সেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধ ছিটাতে হবে। যাবতীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা আগেই দেওয়া হয়েছে।”
দীর্ঘ ছুটির পর ডেঙ্গুর ঝুঁকি কেন বেশি?
ঈদুল আজহার ছুটির আগেও দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা পানি, বাড়ি বা আশেপাশে ফেলে রাখা পাত্র, ফুলের টব, বৃষ্টির জমে থাকা পানি, যত্রতত্র ফেলে রাখা ময়লা আবর্জনা—এসব কারণে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র বিস্তৃত হচ্ছে। রমজান ও পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের বন্ধের সময়ও একই ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এবার ঈদুল আজহার ছুটির পরও সেই একই নির্দেশনা কঠোরভাবে মানতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল ডেঙ্গু প্রতিরোধেই সাহায্য করে না, বরং শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত জরুরি। তাই ক্লাস শুরুর আগে বিদ্যালয়ের আঙিনা, শ্রেণিকক্ষ, করিডোর, টয়লেট, এবং লাইব্রেরিসহ প্রতিটি কোণ পরিষ্কার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ক্লাস শুরুর আগে করণীয় নির্দেশনাগুলো কী কী?
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের চিঠির আলোকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর একটি বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করেছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরুর আগেই মানতে হবে যেসব নির্দেশনা, তা নিচে পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করা হলো:
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুরো চত্বর পরিষ্কার করা। দীর্ঘ ছুটির কারণে শ্রেণিকক্ষ, করিডোর, সিঁড়ি, টয়লেট এবং লাইব্রেরিতে ধুলা ও ময়লা জমে থাকতে পারে। তাই ক্লাস শুরুর অন্তত দুদিন আগে থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করতে হবে।
- শ্রেণিকক্ষ ও আঙিনার সব কোণ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে
- জানালা ও দরজা খুলে দিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে
- মেঝে ও আসবাবপত্র জীবাণুনাশক দিয়ে মুছে ফেলতে হবে
- শিক্ষার্থীদের টেবিল-চেয়ার ধুলামুক্ত করতে হবে
এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হল এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও আশেপাশে কোথাও পানি জমে আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
- ফুলের টব, বালতি, ড্রাম বা অন্যান্য পাত্র উল্টে ফেলে দিন বা ঢেকে রাখুন
- নর্দমা, ড্রেন ও ছাদের কোণায় জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলুন
- ভাঙা টাইলস, ইট বা পাত্রে পানি জমতে না দেওয়ার ব্যবস্থা করুন
- যেখানে পানি জমা হওয়া বন্ধ করা যায় না, সেখানে মশক নিধন ওষুধ ছিটান
প্রয়োজনীয় স্থানে মশক নিধন ওষুধ ছিটানো
পরিষ্কারের পাশাপাশি পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মশক নিধন ওষুধ ছিটানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব স্থানে মশার উপস্থিতি বেশি থাকে, সেখানে অতিরিক্ত সতর্কতা নিতে হবে। শিক্ষকরা নিজেরাই এই কাজ তদারকি করবেন।
- প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ ও করিডোরে ওষুধ ছিটান
- শ্রেণিকক্ষের কোণা, টয়লেটের ভেতর ও বাইরে, এবং খেলার মাঠের আশেপাশে স্প্রে করুন
- যদি সম্ভব হয়, ছুটির আগে বা পরে ফগিং মেশিন ব্যবহার করে পুরো এলাকা জীবাণুমুক্ত করুন
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের করণীয়
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষই নয়, শিক্ষার্থীদেরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষকরা ক্লাসে বসে শিক্ষার্থীদের ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্পর্কে ধারণা দেবেন। আমরা আমাদের পাঠদানের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ছোট ছোট বিষয়গুলো মেনে চললে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
| করণীয় | বিবরণ |
|---|---|
| পূর্ণ হাতা জামা ও প্যান্ট পরা | মশার কামড় থেকে বাঁচতে শরীর ঢেকে রাখা জরুরি |
| স্কুলে মশারি বা মশা নিরোধক ব্যবহার | যেখানে সম্ভব, সন্ধ্যা বা বিকেলে মশারি ব্যবহার করা ভালো |
| জমে থাকা পানি এড়িয়ে চলা | স্কুলের আঙিনায় বা আশেপাশে পানি জমে থাকলে তা শিক্ষককে জানানো |
| হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্ন থাকা | ডেঙ্গু মশার কামড় এড়াতে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা |
কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও তদারকি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষকের উপরই মূল দায়িত্ব বর্তায়। তারা নিশ্চিত করবেন যে, সব নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ইতোমধ্যেই সব প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে যে, ক্লাস শুরুর আগের দিনগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, শুধু একদিনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা যথেষ্ট নয়। ক্লাস শুরুর পরও প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট সময় দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বিশেষ করে বর্ষার সময়ে নিয়মিত পানি জমা আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
বাস্তব অভিজ্ঞতা: ডেঙ্গু প্রতিরোধে যা যা কাজ করে
গত কয়েক বছরে আমি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। আমাদের একটি অভিজ্ঞতা হলো, যখন আমরা নিয়মিত সপ্তাহে একবার করে পুরো প্রতিষ্ঠানে মশক নিধন ওষুধ ছিটানো শুরু করি, তখন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। তারা যদি বুঝতে পারে যে, একটি ছোট জলাধারও এডিস মশার বাসা হতে পারে, তাহলে তারা নিজেরাই সতর্ক হয়ে যায়।
গত ঈদুল ফিতরের ছুটির পরেও অনুরূপ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন অনেক প্রতিষ্ঠানই নির্দেশনাটি অবহেলা করেছিল, ফলে পরবর্তীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। এবার সেই ভুল যাতে না হয়, সেজন্য কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য জরুরি পরামর্শ
- প্রত্যেক শ্রেণিকক্ষের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক নিজ কক্ষের পরিচ্ছন্নতা নিজে তদারকি করবেন
- ছুটির পর প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের ডেঙ্গু সচেতনতা বিষয়ে একটি বিশেষ ক্লাস নিন
- প্রতিষ্ঠানের আশপাশের কোনো রাস্তা বা ড্রেনে পানি জমে থাকলে স্থানীয় পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদকে জানান
- প্রয়োজনে অভিভাবকদেরও এই অভিযানে সম্পৃক্ত করুন
নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার দায়িত্ব সবার
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরুর আগেই মানতে হবে যেসব নির্দেশনা, সেগুলো মেনে চললে শুধু ডেঙ্গু প্রতিরোধই হবে না, বরং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে। দীর্ঘ ছুটির পর শিক্ষার্থীরা যখন ক্লাসে ফিরবে, তখন তাদের স্বাগত জানানোর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
আমার বিশ্বাস, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী এবং অভিভাবক—সবাই মিলে এই নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে মেনে চললে আমরা ডেঙ্গুকে মোকাবিলা করতে পারব। আসুন, আমরা সবাই মিলে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মশামুক্ত ও নিরাপদ রাখার অঙ্গীকার করি। ৭ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন এই শিক্ষাবর্ষটি হোক আনন্দময়, স্বাস্থ্যকর ও সফল।
Durba TV academic Website