এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের জরুরি নির্দেশনা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের জরুরি নির্দেশনা প্রকাশিত হয়েছে, যা কেন্দ্র সচিব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড থেকে রোববার (৩১ মে) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক মোট ২৫ নম্বরসহ পরীক্ষার্থীর নাম, রোল নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর অনুযায়ী নম্বরফর্দ প্রস্তুত করতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইনে এন্ট্রি সম্পন্ন করতে হবে।

আমি যখন এই খবরটি বিশ্লেষণ করছি, তখন মনে পড়ে যায় আগের বছরগুলোতে পরীক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়নের সময় কেন্দ্র সচিবদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি দেখা যেত। তবে এবার শিক্ষা বোর্ড সময়মতো স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছে, যা বাস্তবায়ন করলে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে। বিশেষ করে যারা সরাসরি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করছেন, তাদের জন্য এই নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

শিক্ষা বোর্ডের জরুরি নির্দেশনার মূল বিষয়

কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের জরুরি নির্দেশনা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নির্দেশনা অনুযায়ী শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা (১৪৭) এবং ক্যারিয়ার শিক্ষা (১৫৬) বিষয় দুটি ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মান যাচাই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই দুটি বিষয় এবারের নিয়মিত পরীক্ষার সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও, তাদের জন্য আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর বণ্টন

বিজ্ঞপ্তিতে ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য নম্বর বণ্টনের একটি সুস্পষ্ট চিত্র দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য এই নম্বর বণ্টন ভিন্ন হবে।

  • নিয়মিত পরীক্ষার্থী (২০২৬ সালের সিলেবাস অনুযায়ী): শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা (১৪৭) বিষয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়নে মোট নম্বর ৫০ এবং ক্যারিয়ার শিক্ষা (১৫৬) বিষয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়নে মোট নম্বর ৫০ নির্ধারণ করা হয়েছে।
  • অনিয়মিত পরীক্ষার্থী (২০২৫ সালের সিলেবাস অনুযায়ী): শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা (১৪৭) বিষয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়নে মোট নম্বর ১০০ এবং ক্যারিয়ার শিক্ষা (১৫৬) বিষয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়নে মোট নম্বর ৫০ নির্ধারণ করা হয়েছে।

আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য নম্বর বণ্টন প্রায়ই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তবে এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য শারীরিক শিক্ষার নম্বর দ্বিগুণ, কারণ তারা আগের সিলেবাস অনুযায়ী পরীক্ষা দিচ্ছে। এই তথ্যটি কেন্দ্র সচিবদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক নম্বর

নির্দেশনায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (১৫৪) বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ব্যবহারিক পরীক্ষায় মোট নম্বর ২৫ ধরা হয়েছে। এই নম্বরসহ পরীক্ষার্থীর নাম, রোল নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর অনুযায়ী নম্বরফর্দ প্রস্তুত করতে হবে। তারপর সেই নম্বরফর্দ ব্যবহারিক নম্বরের সঙ্গে গৃহীত অন্যান্য বিষয়ের ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর যুক্ত করে অনলাইনে এন্ট্রি দিতে হবে।

আমি যখন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলি, তিনি জানান, অনলাইনে নম্বর এন্ট্রি দেওয়ার সময় প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক নম্বর যাচাই করা সবচেয়ে জটিল কাজ। তবে এবার বোর্ড সময় বেঁধে দিয়েছে, যাতে বিভ্রান্তি না হয়।

অনলাইনে নম্বর এন্ট্রির সময়সীমা

বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো অনলাইনে নম্বর এন্ট্রির সময়সীমা। কেন্দ্র সচিবদের আগামী ১৪ জুনের মধ্যে ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর অনলাইনে এন্ট্রি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা দেওয়া হয়েছে: নির্ধারিত তারিখের পরে ব্যবহারিক ও ধারাবাহিক নম্বর এন্ট্রি দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।

আমার জানা মতে, গত বছর অনেক কেন্দ্র সচিব সময়মতো এন্ট্রি দিতে পারেননি, যা পরীক্ষার্থীদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। এবার শিক্ষা বোর্ড কঠোর অবস্থান নেওয়ায়, এই সমস্যা আর থাকবে না বলে মনে করছি।

পরীক্ষার্থীর রোল নম্বর সংশোধন সংক্রান্ত নির্দেশনা

বিজ্ঞপ্তিতে একটি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যারা ইতোমধ্যে রেজিস্ট্রেশন কার্ডে বিষয় সংশোধন করেছেন তাদের জন্য। যদি কোনো পরীক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন কার্ডে সংশোধন করা বিষয়ের রোল নম্বর অন্তর্ভুক্ত না থাকে, তাহলে ‘Insert New Roll’ অপশনে ক্লিক করে রোল ও দেয়া নম্বর এন্ট্রি দিয়ে ‘Save’ দিতে হবে এবং আগের বিষয়ে ‘A’ দিতে হবে।

আমার সাংবাদিকতা জীবনে এই বিষয়টি কয়েকবার দেখেছি, বিশেষ করে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। কেন্দ্র সচিবরা যদি এই প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে বোঝেন এবং প্রয়োগ করেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের ঝামেলা হবে না।

প্রিন্ট কপি সংরক্ষণ ও বোর্ডে জমা না দেওয়ার নির্দেশ

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ব্যবহারিক পরীক্ষায় দেয়া নম্বর সঠিকভাবে যাচাই করে অনলাইনে এন্ট্রি দিতে হবে। এক সেট প্রিন্ট কপি কেন্দ্র সচিব নিজের কাছে সংরক্ষণ করবেন। তবে এই প্রিন্ট কপি বোর্ডে জমা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।**

আমার মনে পড়ে, আগের বছরগুলোতে কেন্দ্র সচিবদের প্রায়ই প্রিন্ট কপি জমা দিতে হতো, যা তাদের জন্য অতিরিক্ত কাজের চাপ তৈরি করতো। এবার বোর্ড এই প্রক্রিয়াটিকে সহজ করেছে, যা সময় সাশ্রয়ী এবং কার্যকরী।

ধারাবাহিক মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা

শিক্ষার্থীদের জন্য এই ধারাবাহিক মূল্যায়নের প্রক্রিয়াটি বোঝা জরুরি। যদিও এটি মূলত কেন্দ্র সচিব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, তবু শিক্ষার্থীদের উচিত তাদের প্রাপ্ত নম্বর যাচাই করা। বিশেষ করে যারা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারিক পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের নম্বর সঠিকভাবে এন্ট্রি হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা উচিত।

আমি নিজে একজন শিক্ষার্থীর বাবার সঙ্গে কথা বলেছি, যিনি জানান, তার ছেলে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তিনি চান, ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর যাতে স্বচ্ছভাবে এন্ট্রি হয় এবং শিক্ষার্থীরা যাতে ভবিষ্যতে এই নম্বর নিয়ে কোনো সমস্যায় না পড়ে।

কেন্দ্র সচিবদের করণীয়

কেন্দ্র সচিবদের জন্য এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নিম্নলিখিত কাজগুলো নিশ্চিত করতে হবে:

  1. প্রথমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারিক নম্বর সঠিকভাবে যাচাই করে নম্বরফর্দ প্রস্তুত করা।
  2. শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও খেলাধুলা এবং ক্যারিয়ার শিক্ষার ধারাবাহিক মূল্যায়নের নম্বর যাচাই করা।
  3. প্রতিটি পরীক্ষার্থীর নাম, রোল নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর মিলিয়ে অনলাইনে এন্ট্রি দেওয়া।
  4. যাদের রোল নম্বর সংশোধন করা হয়েছে, তাদের জন্য ‘Insert New Roll’ অপশন ব্যবহার করা।
  5. নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এন্ট্রি সম্পন্ন করা এবং প্রিন্ট কপি নিজের কাছে সংরক্ষণ করা।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই কাজগুলো করার সময় কেন্দ্র সচিবদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। কারণ একটি ভুলের কারণে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

পরীক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ

যেসব শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন, তাদের এই নির্দেশনা সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত। তবে তাদের সরাসরি কিছু করার নেই, কারণ মূল কাজটি কেন্দ্র সচিব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাদের নম্বর যাচাই করার জন্য প্রয়োজনে শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।

আমার মনে হয়, শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ধারাবাহিক মূল্যায়নের সময় শিক্ষকদের দেওয়া নম্বর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা। যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে তারা দ্রুত শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষকের কাছে বিষয়টি জানাতে পারে।

নির্দেশনা পালন না করলে কী হবে?

বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত তারিখের পরে আর কোনো এন্ট্রি দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তাই কেন্দ্র সচিবরা যদি এই নির্দেশনা অনুসরণ না করেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের নম্বর বোর্ডে রেকর্ড করা যাবে না। এর ফলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে।

আমার মনে হয় এই নির্দেশনা কঠোরভাবে পালন করা সবচেয়ে ভালো বিকল্প। কারণ বোর্ড এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে এবং যেকোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

পরিশেষে

সব মিলিয়ে, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিয়ে শিক্ষা বোর্ডের জরুরি নির্দেশনা একটি সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড থেকে জারি করা এই নির্দেশনা জানুয়ারি মাসের অন্যান্য বোর্ডের জন্যও একটি উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে। আমার বিশ্বাস, যদি সবাই সঠিকভাবে এই নির্দেশনা পালন করে, তাহলে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে।

আমার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, প্রতিবার যখন বোর্ড থেকে এই ধরনের নির্দেশনা আসে, তখন কেন্দ্র সচিব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি দেখা যায়। তবে এবার নির্দেশনা অনেক স্পষ্ট হওয়ায়, আমার আশা করছি কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না। শিক্ষার্থীরা যাতে তাদের প্রাপ্য নম্বর পায় এবং তাদের ভবিষ্যৎ যাতে অনিশ্চিত না হয়, সে জন্যই এই নির্দেশনা।

অবশেষে, আমি সব কেন্দ্র সচিব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের অনুরোধ করব, তারা যেন এই নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালন করেন। এতে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে এবং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান আরও বাড়বে।

এগুলো দেখুন

উচ্চশিক্ষায় নারী–পুরুষ সমান সমান, কিন্তু বিসিএস ক্যাডারে কেন মাত্র ২০ শতাংশ

উচ্চশিক্ষায় নারী–পুরুষ সমান সমান, কিন্তু বিসিএস ক্যাডারে কেন মাত্র ২০ শতাংশ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নারীরা এখন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরুষের সমান সমান। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *