৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লিনার নিয়োগের চিন্তা সরকারের

দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিনের আলোচিত একটি দাবি এখন বাস্তবায়নের পথে। দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী (ক্লিনার) না থাকায় বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা রক্ষার কাজে শিক্ষকদের সম্পৃক্ত হতে হচ্ছে, যা তাদের মূল কাজের প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই অবস্থার পরিবর্তন হতে চলেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিদ্যালয়গুলোতে ক্লিনার নিয়োগের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ।

প্রতিমন্ত্রী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই ভাবনার কথা জানান। যদিও তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, পুরো বিষয়টি আসন্ন বাজেটের ওপর নির্ভর করছে। তার ভাষ্য, ‘আসন্ন বাজেটে ক্লিনার নিয়োগের বিষয়গুলো রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সেফটি-সিকিউরিটির জন্য এগুলো জরুরি। বিষয়গুলো অনুধাবন করে অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ এই মন্তব্যেই ফুটে উঠেছে সরকারের আগ্রহ ও বাস্তবিক সীমাবদ্ধতার কথা।

৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লিনার নিয়োগের চিন্তা সরকারের

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাথমিকের ৬৫ হাজার বিদ্যালয়ের অধিকাংশেই কোনো ক্লিনার নেই। এর ফলে বিদ্যালয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ শিক্ষকদেরকেই করতে হয়। সহকারী শিক্ষক আবু মূসা জানান, ‘এমনিতেই কাজের ব্যস্ততা ও চাপে মানসম্মত ও প্রত্যাশিত পাঠদান অনেকটাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এর ওপর যদি ক্লিনিংয়ের মতো কাজ করতে হয়, তবে বিষয়টি সত্যিই কষ্টকর।’

শুধু তাই নয়, অফিস সহকারী না থাকার কারণে শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজও সামলাতে হয়। প্রধান শিক্ষককে সহায়তার জন্য একজন অফিস সহায়ক নিয়োগের দাবিও জোরালো হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে। এক শিক্ষক বলেন, ‘অফিস সহকারী না থাকার কারণে আমাদের যাবতীয় কাজ করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদানে ব্যাঘাত ঘটছে, অন্যদিকে শিক্ষকদের ভেতরে সৃষ্টি হচ্ছে চাপা ক্ষোভ।’

পরিচ্ছন্নতার অভাবে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি শিক্ষার পরিবেশও নষ্ট হয়। শিক্ষকদের এই বাড়তি বোঝা কেবল তাদের মানসিক চাপই বাড়ায় না, বরং পাঠদানের মানকেও প্রভাবিত করে। এই বাস্তবতা সামনে রেখেই সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে জোরালোভাবে ক্লিনার নিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

শিক্ষক সমিতির বিবৃতি: স্বাধীনতার ৫০ বছরেও কি হয়নি এই কাজ?

গত ১১ মে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে শিক্ষক সমিতির নেতারা বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিনিয়ত শত শত, হাজার হাজার শিক্ষার্থীর আসা-যাওয়া করে থাকেন। শিশু শিক্ষার্থীরা কাগজ, খাবারের খোসা ঝুড়িতে ফেললেও ধুলাবালিতে পরিপূর্ণ থাকে পুরো বিদ্যালয়। অথচ স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।’ তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়, উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় একাধিক পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছে, কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই সুযোগ নেই।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার এই দৃশ্য জনগণের মধ্যেও বিরূপ ধারণা তৈরি করে। তারা আরও উল্লেখ করে যে, ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিজস্ব উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে থাকেন। এতে জনগণের কাছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।’

উল্লেখ্য, এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ক্লিনার বা অফিস সহকারী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। সে সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেনও বিদ্যালয়গুলোতে অফিস সহকারী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় থাকার কথা জানিয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি আর পূর্ণতা পায়নি।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা: কাঠামোগত সমাধানের পথে

প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, শুধু নতুন পদ সৃষ্টিই নয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের বিষয়টিকে একটি স্থায়ী ও কার্যকর কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। এজন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন বা বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘বিষয়গুলো নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসা যায় কিনা সেদিকেও আমাদের নজর রয়েছে।’

এই ইঙ্গিতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নীতিমালার আওতায় এলে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারের সময়েই এই সংকটের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে। দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই সমাধানের জন্যই এই পদক্ষেপ।

 বিদ্যালয়ের ধরণ ও কর্মচারীর সংখ্যা একটি তুলনামূলক চিত্র

বিদ্যালয়ের ধরণ পরিচ্ছন্নতাকর্মী (প্রায়) অন্যান্য চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মন্তব্য
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শূন্য (৬৫ হাজার বিদ্যালয়ে) না শিক্ষকদের দ্বারাই পরিচ্ছন্নতা ও প্রশাসনিক কাজ
সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ১-২ জন (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে) হ্যাঁ (অফিস সহায়ক, দারোয়ান) পৃথকভাবে পরিচ্ছন্নতা ও সহায়ক কর্মী রয়েছে
সরকারি মাদ্রাসা/কলেজ ২-৪ জন (প্রয়োজন অনুযায়ী) হ্যাঁ (একাধিক পদ) প্রশাসনিক ও পরিচ্ছন্নতা কাজের জন্য আলাদা জনবল

শিক্ষকদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সারা দেশেই এই সংকটের মুখোমুখি। শুধু পরিচ্ছন্নতার কাজ নয়, বিদ্যালয় ভর্তি, বিভিন্ন ফরম পূরণ, বিদ্যুৎ-পানি বিল দেওয়াসহ নানা প্রশাসনিক কাজও তাদের করতে হয়। এই অতিরিক্ত কাজের চাপে তাদের শ্রেণি পাঠদানে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একজন প্রধান শিক্ষক জানান, ‘আমাদের দিন শুরু হয় ঝাড়ু হাতে, শেষ হয় রেজিস্টার মাথায় দিয়ে। এর মধ্যে ক্লাস নেওয়াটা যেন একটি বাড়তি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতারা মনে করেন, ‘বিদ্যালয়ে ক্লিনার নিয়োগ হলে শিক্ষকদের ওপর থেকে এই অমানবিক বোঝা কমবে। এর ফলে তারা শিক্ষার্থীদের পাঠদানে মনোনিবেশ করতে পারবেন, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও এই নিয়োগের অন্যতম উদ্দেশ্য। পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ভালো হয়। তাই শুধু শিক্ষকদের স্বস্তির জন্যই নয়, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্যও এই উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।

সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, ৬৫ হাজার বিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়া। দ্বিতীয়ত, নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করা। তৃতীয়ত, প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য উপযুক্ত সংখ্যক কর্মী নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ। সর্বোপরি পুরো বিষয়টি বাজেটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সবচেয়ে বড় বিষয়।

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আসন্ন বাজেটে এর জন্য বরাদ্দ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে বাজেট পাস ও তার বাস্তবায়ন পর্যন্ত কিছুটা সময় লাগতে পারে। সরকার চাইছে এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান দিতে, যা ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারকেই এই সংকট মোকাবিলা করতে না হয়।

একটি স্বাস্থ্যকর ও শিক্ষামুখী পরিবেশের প্রত্যাশা

দেশের প্রায় ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লিনার নিয়োগের চিন্তা সরকারের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটি কেবল শিক্ষকদের ওপর থেকে বাড়তি চাপ কমানোর জন্যই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করার জন্যও অপরিহার্য। শিক্ষক সমিতি থেকে শুরু করে ক্ষুদে শিক্ষার্থী, সবার প্রত্যাশা এই উদ্যোগ যাতে আর আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে রূপ নেয়। সরকারের মনোযোগ ও সদিচ্ছা থাকলে, ‘৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লিনার নিয়োগ’ শীর্ষক এই খবর খুব শীঘ্রই দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। আগামী বাজেট উপস্থাপনের পরই এই বিষয়টির ভবিষ্যৎ স্পষ্ট হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

এখন অপেক্ষা সরকারের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর। যদি সেটি হয়, তাহলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে, যেখানে শিক্ষকরা পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবেন শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে এবং শিক্ষার্থীরা পাবে একটি পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষাঙ্গন। সরকারের এই ইতিবাচক চিন্তাভাবনা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নিতে সার্বিক সমর্থন ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে ধরবে দেশবাসী।

এগুলো দেখুন

উচ্চশিক্ষায় নারী–পুরুষ সমান সমান, কিন্তু বিসিএস ক্যাডারে কেন মাত্র ২০ শতাংশ

উচ্চশিক্ষায় নারী–পুরুষ সমান সমান, কিন্তু বিসিএস ক্যাডারে কেন মাত্র ২০ শতাংশ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নারীরা এখন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরুষের সমান সমান। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *